Breaking News

আশ্রিত রোহিঙ্গারাই হয়ে উঠছে ‘বিষফোঁড়া’

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক বাহিনীর শুরু হওয়া গণহত্যা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী। এছাড়া বিগত তিন দশক ধরে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশে এখন সেই সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১১ লাখ।
কক্সবাজার, টেকনাফ ও উখিয়ার ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় দেওয়া হয় এসব রোহিঙ্গাদের। এর মধ্যে ১৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তর করেছে সরকার। সেখানে তাদের জন্য করা হয়েছে নিরাপদ আবাসনসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা।

এত সুবিধার পরেও ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাওয়া, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ও সন্ত্রাসী নানা কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। গত এক বছরেরও বেশি সময়কালে নারী-পুরুষসহ অসংখ্য রোহিঙ্গাকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পাঠানো হয়েছে জেলে। এরপরও কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না আশ্রিত এসব রোহিঙ্গাদের অনিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম।

গত বছরের ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে বিদেশি অস্ত্রসহ আব্দুর রাজ্জাক নামে এক রোহিঙ্গা যুবককে আটক করে পুলিশ। তাকে আটকের পর থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

কখনো পেটে করে, কখনো গাড়িতে করে আবার কখনো ভিন্ন কোনো কৌশলে টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পৌঁছে দিতেন আব্দুর রাজ্জাক। আর সেই ইয়াবা বিক্রির টাকায় অস্ত্র কিনে ফিরে যেতেন টেকনাফ। সেদিনও ঢাকায় ইয়াবা বিক্রির পর অস্ত্র নিয়ে টেকনাফে ফিরে যাচ্ছিলেন তিনি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার ও সংঘর্ষের সময় ব্যবহৃত হতো সেসব অস্ত্র।

আব্দুর রাজ্জাককে আটকের পর তার দেওয়া তথ্যমতে টেকনাফের হ্নীলা লেদা ক্যাম্প থেকে মো. কামাল নামে আরো এক রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। অস্ত্রটি তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল রাজ্জাকের। তবে শুধু রাজ্জাক নয়, তাদের দলে অন্তত ১শ’ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ কাজ করেন বলে সে সময় জিজ্ঞাসাবাদে জানান তারা।

পরে দুজনকে রিমান্ডে নেয়া হলে নগরীর চান্দগাঁও থানার নিউ চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের তথ্য দেন তারা। ১৩ নভেম্বর সেই বাসায় অভিযান চালিয়ে এক নারীসহ চার রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন- মাসুদ ফোরকান, তার স্ত্রী শামীম আরা সুমি, মোবারক হোসেন ও মো. রাসেল।

তাদের কাছ থেকে আট লাখ ৮৩ হাজার ৬২২ টাকা, ২৩ হাজার ২০০ ইয়াবা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১২টি চেক বই উদ্ধার করা হয়। আটক চারজনের মধ্যে দুজনের সরাসরি মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বলে সে সময় জানায় পুলিশ।

এর পাঁচদিন আগে ৮ নভেম্বর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার অন্য একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে এক কোটি ১৭ লাখ টাকা ও সোয়া পাঁচ হাজার ইয়াবাসহ শওকত ইসলাম ও মর্জিনা নামে এক রোহিঙ্গা দম্পতিকে আটক করে র‍্যাব।

এর আগে র‍্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে জানালা দিয়ে টাকা বাইরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু বিষয়টি ভবনের নিচে থাকা র‍্যাব সদস্যদের নজরে এলে টাকাগুলো উদ্ধার করা হয়। পরে সব মিলিয়ে তাদের কাছ থেকে ১৭ লাখ এক হাজার ৫শ’ টাকা ও পাঁচ হাজার ৩শ’ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

মিয়ানমারের একটি চক্রের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল বলে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে জানায় এ দম্পতি। মিয়ানমার থেকে টেকনাফ হয়ে চট্টগ্রামে ইয়াবা এনে পরবর্তীতে তা বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবনকারীদের কাছে সরবরাহ করতেন তারা।

এছাড়া একই বছরের ২৯ অক্টোবর কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ক্রসিং মোড় থেকে ১৯ হাজার ৭শ’ ইয়াবাসহ মো. জহির নামে এক রোহিঙ্গা যুবককে আটক করে র‍্যাব। আটককৃত জহির নিজের পরিচয় গোপন করে সাতকানিয়া এলাকার এক বাংলাদেশি নারীকে বিয়ে করে ওই এলাকায় বসবাস করছিলেন।

এদিকে, চলতি বছরের ২০ আগস্ট নগরীর বাকলিয়া ও কোতোয়ালি থানা এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে চার হাজার ৪শ’ ইয়াবাসহ মো. হাফিজুল্লাহ ও মো. আরমান নামে দুই রোহিঙ্গা কিশোরকে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চল।

সর্বশেষ ২৫ আগস্ট মিরসরাই উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিজামপুর এলাকায় ঢাকামুখী একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে এক হাজার ৫শ’ ইয়াবাসহ হালিমা আক্তার নামে এক রোহিঙ্গা নারীকে আটক করে পুলিশ। আটক হালিমা কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের বি-ব্লকের ৮৫ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে যাত্রীবাহী বাসে চড়ে ইয়াবা সরবরাহ করছিলেন তিনি।

এমন ধরপাকড়েও যেন থামানো যাচ্ছে না এসব রোহিঙ্গাদের দৌরাত্ম্য। তবে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না বলেও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এসপি রশিদুল হক বলেন, সম্প্রতি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে বোয়ালখালী চলে আসা কিছু রোহিঙ্গাকে আটক করে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়া কয়েকদিন আগেও মিরসরাইয়ে ইয়াবাসহ এক রোহিঙ্গা নারীকে আটক করা হয়। তাদের ব্যাপারে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।

নগর পুলিশের কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে রয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। এরই মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

About desk

Check Also

প্রকৌশলীর মোটরসাইকেল আটক করায় ট্রাফিক অফিসে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন

ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহন চেকিং করছিল ট্রাফিক পুলিশ। সেখানে নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *