ট্রে”নে পা”থর নি”ক্ষে”পে কা”ড়ছে প্রা”ণ

ট্রেন ভ্রমণ সাশ্রয় হলেও যেন নিরাপদ থাকছে না। দিন কিংবা রাতে যাত্রীবাহী ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বাড়ছে। নিক্ষিপ্ত পাথরে কেউ আহত কেউ পঙ্গুত্ববরণ করছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে কারও প্রাণও যাচ্ছে। গত দেড় যুগ ধরে ঘটে চলেছে এমন ভয়াবহ ঘটনা। এর সমাধানের পথ খুঁজে পাচ্ছে না রেল। ফলে ভ্রমণে আতঙ্কে থাকছেন যাত্রীরা।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত মাসে ১৭টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। গত কয়েক মাসে শুধু পূর্বাঞ্চল রেলে যাত্রীবাহী ট্রেনে শতাধিক পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত ২০ জন, গুরুতর আহত হয়েছেন ৬ জন। শতাধিক গ্লাস ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলে ৫৫টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক লোক। গ্লাস ভেঙেছে ৫৫টি। ক্ষতিগ্রস্তরা কোনো ক্ষতিপূরণ পান না।

এ নিয়ে রোববার রেলভবনে রেলওয়ে দু’অঞ্চলের মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বাড়ায় বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। রেলপথমন্ত্রী, রেলওয়ে সচিব ও রেলওয়ে মহাপরিচালক পাথর নিক্ষেপ বন্ধে করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন। পরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে মিডিয়ায় সচেতনতামূলক প্রচার কামনা করে সংবাদ সম্মেলন করেন রেলপথমন্ত্রী। তিনি বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত লোকজন এবং সাধারণ যাত্রীরা গুরুতর আহত হচ্ছেন। কেউ চোখ হারাচ্ছেন। কেউবা প্রাণ। তিনি বলেন, বর্বর এই কাজ বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসন-জনপ্রতিনিধি ও সচেতন জনগণকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

এদিকে মাঠপর্যায়ের রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৯ সালে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা প্রায় ৫ শতাধিক ছাড়িয়েছিল। ২০২০ সালে করোনাকালে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বারবার ঘটেছে। ২০১৯ সালে পাথরের আঘাতে ট্রেনের ভেতরে থাকা জিসান নামের এক শিশু গুরুতর আহত হয়। এর আগের বছর পাথরের আঘাতে রেলওয়ের টিআই শিকদার বায়োজিত মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৩ সালে পূর্বাঞ্চল রেলে চলন্ত ট্রেনে ছোড়া ঢিলে প্রকৌশলী প্রীতি দাশ নিহত হওয়ার পর রেল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি করেছিল। ওই কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ট্রেনে দুষ্কৃতকারীরা ইচ্ছা করেই পাথর নিক্ষেপ করে। বিগত সময়ে পাথর নিক্ষেপকারীদের কয়েকজন আটক হলে সেই সত্যতা বেরিয়ে আসে। বছরের পর বছর ডাকাতি ও ট্রেনের ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যেও এ বর্বর কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে আসছে।

রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারা অনুযায়ী, ট্রেনে পাথর ছোড়া হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে পাথর নিক্ষেপে কারও মৃত্যু হলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু উল্লিখিত আইনে কারও শাস্তির নজির নেই। দশ বছরে শুধু পাথরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দরজা ও জানালার গ্লাস মেরামত ও বদলাতে প্রায় ৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন যুগান্তরকে বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ মানেই হচ্ছে, যে কোনো যাত্রী গুরুতর আহত বা নিহতও হতে পারেন। এটি একটি জঘন্য অপরাধ। ফৌজদারি এ অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের শাস্তির ব্যাপারে আমরা কঠোর হচ্ছি। অপরাধী চিহ্নিত করতে মাঠে গোয়েন্দা বাহিনীসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক, ইমাম, সংস্কৃতিকর্মীদের সমন্বয়ে প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে। এ সময় ট্রেনযাত্রীদের আশ্বস্ত করে বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। পাথর নিক্ষেপ কঠোরহস্তে রোধ করা হবে। ট্রেনে অস্ত্রধারী পুলিশসহ চিহ্নিত স্থানগুলোতে স্থানীয় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্কাবস্থায় রয়েছে। চিহ্নিত এলাকায় গোপন ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। অভিভাবকদেরও সতর্ক করে মন্ত্রী বলেন, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। খেলার ছলে কিংবা না বুঝে পাথর নিক্ষেপ, এমন অজুহাতে কেউ পার পাবে না। অপরাধীদের অভিভাবকদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

রোববার রেলপথ সচিব সেলিম রেজা যুগান্তরকে বলেন, ‘ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। যে কোনো মূল্যে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। যাত্রীরা শঙ্কা-ভয়ভীতি নিয়ে ট্রেন ভ্রমণ করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে আমরা চিহ্নিত এলাকায় বিশেষ কৌশল অবলম্বন করছি। অপরাধীরা ধরা পড়বে। সাধারণ যাত্রীদের অনুরোধ জানিয়ে সচিব বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অ্যালুমিনিয়াম সাটার লাগানোসহ জানালার বাইরে হাত কিংবা মাথা যেন না রাখা হয়।’

রেলওয়ে গোয়েন্দা সংস্থা দুই শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করেছে; যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে-পূর্বাঞ্চল রেলের ঢাকা-বিমানবন্দর-টঙ্গী, তেজগাঁও-ঢাকা-ক্যান্টনমেন্ট, টঙ্গী-বিমানবন্দর, কুমিল্লা-সদর রসুলপুর-কুমিল্লা, ভৈরববাজার, সীতাকুন্ড-বারতাকিয়া, সীতাকুন্ড-বারৈয়াচালা, ঘোড়াশাল-আখাউড়া, রাজাপুর-রসুলপুর, শায়েস্তাগাঁও, ভৈরববাজার-আশুগঞ্জ। পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহেড়া-মাঝগ্রাম, মহেড়া-টাঙ্গাইল, টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব, মহেড়া-মির্জাপুর, ঢাকা-টঙ্গী, কুষ্টিয়া-জগতি। এ ছাড়াও পূর্বাঞ্চলে দিন কিংবা রাতে পাথর ছোড়া হচ্ছে-চট্টগ্রাম, পাহাড়তলী, সীতাকুন্ড, বাড়বকুন্ড, ফেনী, ফাজিলপুর, কালীদহ, সিলেট, ফেঞ্চুগঞ্জ, মাইজগাঁও, নরসিংদী, নরসিংদী সদর, জিনারদী, ঘোড়াশাল। পশ্চিমাঞ্চলের চুয়াডাঙ্গা, নাটোর, আব্দুলপুর, শহিদ মনসুর আলী রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম, উল্লাপাড়া, সলপ, জামতৈল, মুলাডুলি, বড়ালব্রিজ, ভাঙ্গুরা, ভেলুরপাড়া, বামনডাঙ্গা, আক্কেলপুর, ফুলতলা, কিসমত ও রুহিয়া।

রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) মো. মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরী জানান, রেলপথ এলাকার মানুষকে সচেতন হতে হবে। পাথর নিক্ষেপকারীদের তারাই আটক ও প্রতিহত করবেন। এ জন্য আমরা বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছি। গ্লাস ভাঙা দরজা-জানালা টেন্ডারের মাধ্যমে বিদেশ থেকে কিনতে হয়। স্থানীয়ভাবে এসব গ্লাস না পাওয়ায় অপেক্ষা করতে হয়। ওই সময়ে যাত্রীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। দেশের সম্পদ ও যাত্রীদের সুরক্ষায় সাধারণ মানুষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে মহা-ব্যবস্থাপক মিহির কান্তি গুহ যুগান্তরকে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে পুলিশের টহল বাড়াতে হবে। পাশাপশি এলাকার সাধারণ মানুষদের পাথর নিক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

About desk

Check Also

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিযবুত তাহরীর সদস্য গ্রে’ফ’তা’র।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় হিযবুত তাহরীর (নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন) এক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব। গত শুক্রবার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *