ভাঙা মোবাইল নিয়ে গেল খুনির কাছে! অতঃপর যা ঘটলো

রাসেল সরকার। গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরের ব্যবসায়ী। দোকান থেকে সেদিন বাসায় ফিরেই আবারও বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। সঙ্গে রয়েছে তার ব্যবসায়ী বন্ধু দীপঙ্কর। রাসেলের স্ত্রী বাইরে যাওয়ার কারণ জানতে চায় রাসেলের কাছে। রাসেল তার স্ত্রীকে জানায়, পাওনা টাকা আদায় করতে বাইরে যাচ্ছেন তিনি। দ্রুত ফিরে আসার কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়ে যান রাসেল।

২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবরের ঘটনা এটি। রাত বাড়ে, রাসেল ফেরে না। রাসেলের স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই সবাই ভীষণ চিন্তিত। রাতেই বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নেন তারা। কিন্তু রাসেলের দেখা নেই। তার মোবাইল ফোনও ছিল বন্ধ। পরদিন সাদুল্যাপুরের গ্রামে বেশ শোরগোল। বড় দাউদপুর গ্রামের জনৈক মাজেদ সরকারের কলা খেতের উত্তর-পূর্ব কোণে একটি লাশ পড়ে আছে। ২/৩ জনের চোখে পড়ে প্রথমে। আধা ঘণ্টার মধ্যে পুরো গ্রামে রটে যায় খবরটি। এ খবর যায় রাসেলদের বাসাতেও। রাসেলের বাবা সে সময় বাজারে।

বাজারেই লোকমুখে তিনি শুনতে পান, লাশটি দেখতে রাসেলের মতো। এমন কথা শুনে রাসেলের বাবা ছুটে যান কলা খেতে। বাবার চোখের সামনে পড়ে আছে ছেলে রাসেলের লাশ। ছেলের লাশ দেখতেই গগনবিদারি আহাজারি বাবার। ছেলের গলার চারপাশজুড়ে কালো দাগ ও বুকে ধারালো সুচের অনেক আঘাতের দাগ দেখতে পান। ইতিমধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে। তারা লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি ভাঙা মোবাইল ফোন ও একটি বাংলালিংকের সিম খুঁজে পান। সাদুল্যাপুর থানায় এ ব্যাপারে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

থানা পুলিশ তদন্ত কাজ শুরু করে। কিন্তু তদন্তে উল্লেখ করার মতো কোনো অগ্রগতি নেই। ভাঙা মোবাইল ফোন বা সিম ব্যবহারেও কোনো অগ্রগতি করতে পারল না পুলিশ। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডির কাছে।
গাইবান্ধার সিআইডি কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. সবুর মিয়া তদন্তের ভার গ্রহণ করেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। জব্দ করা মোবাইল ফোন ও সিমও তদন্তের জন্য আলামত হিসেবে নেন। সিআইডি কর্মকর্তা এরপর তদন্ত শুরু করেন। সিআইডি কর্মকর্তা সবুর মিয়া তদন্তের শুরুতেই বাংলালিংক সিম পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেন।

সিমটির রেজিস্ট্রেশন ফরম ও সিডিআর সংগ্রহ করে দেখা যায়, সিমটির মালিক নজরুল ইসলাম। তার বাড়ি কুড়িগ্রামে। পুলিশ অনেকটাই নিশ্চিত যে, খুনি তাদের নাগালে। পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে আসে। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ যা জানতে পারল তাতে করে হতাশ। তার কাছ থেকে খুন-সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্যই পেল না পুলিশ। নজরুল পুলিশকে জানায়, নম্বরটি নিজ নামে উঠিয়ে ব্যবহার করছিলেন। কিন্তু তার মোবাইল সেটসহ সিমটি রংপুর থেকে রাজশাহী যাওয়ার সময় রাস্তায় হারিয়ে গিয়েছিল। ওই বাংলালিংক নম্বরের সিডিআর ও রাসেলের ফোন নম্বরের সিডিআর পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, খুনের আগে রাসেলের সঙ্গে এই নম্বর দিয়ে কথা বলা হয়েছিল। ওই বাংলালিংক নম্বরটি যে মোবাইল সেটে ব্যবহার করে কথা হয়েছিল তার ইএমআই এর সিডিআর সংগ্রহ করেন সিআইডির কর্মকর্তা। তিনি দেখতে পান ঘটনার আগে একই সেটে অপর আরেকটি সিম কার্ড ব্যবহার করা হয়েছিল।

পুলিশ ওই নম্বরের মালিকের নাম ও ঠিকানা বের করেন। তাতে দেখতে পান, এর মালিক একজন মহিলা। তার নাম রোজিনা। রোজিনার স্বামীর নাম হলেন রাজা। আর রাজা হলেন সাদুল্যাপুরের বাসিন্দা। এই সিমটি রাজা ব্যবহার করতেন। এরপরই পুলিশ রাজাকে গ্রেফতার করে। এই রাজা ঘটনার পর থেকেই এলাকা ছেড়েছিলেন। পুলিশ রাজা মিয়াকে জেরা করলে বেরিয়ে আসে খুনের রহস্য। রাজার কাছ থেকে সিআইডি জানতে পারে, রাসেলের খুনের পেছনে শুধু টাকা লেননেদের বিষয় ছিল না। অন্যান্য শত্রুতাও এর পেছনে কাজ করেছে। রাসেল খুনের সঙ্গে রাজা মিয়া ছাড়াও রয়েছেন মকছেদুল, হোজাইফা, ছোটন এবং শাহিন।

About desk

Check Also

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিযবুত তাহরীর সদস্য গ্রে’ফ’তা’র।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় হিযবুত তাহরীর (নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন) এক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব। গত শুক্রবার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *