Breaking News

৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১: রংপুরে মুক্তিযোদ্ধারা ৩দিন বিস্কুট আর পানি খেয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে

১৯৭১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দিনটি ছিল সোমবার। এদিন রংপুরের শঠিবাড়ি বন্দরে ৩১৫ জন মুক্তিযোদ্ধারা হেডকোয়ার্টার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভোরে হানাদার বাহিনী ছয় ইঞ্চি মর্টার ও রকেট লঞ্চার দিয়ে শঠিবাড়ি বন্দরে মুক্তিযোদ্ধাদের বাঙ্কার এবং ডিফেন্সে তুমুল আক্রমণ শুরু করে। একদিকে খাবার নেই। ৩ দিন পার হয়ে গেছে কেবল বিস্কুট এবং পানি খেয়ে। তবুও মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে জীবনবাজি রেখে লড়ে চলল শঠিবাড়ি বন্দরে।

রাত আটটার দিকে শঠিবাড়ির ডানদিকে মুক্তিযোদ্ধারা আকস্মিকভাবে তিনশ’ গজ ছুটে গিয়ে হানাদারদের কয়েকটি ডিফেন্স পজিশন দখল করে নিল। এটি ছিল একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ। সেই ডিফেন্স লাইনে ছিল প্রায় দেড় শ’ রাজাকার। তারা অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করল। আহত কোম্পানি কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক রাজাকারদের ফ্রন্ট লাইনে বসিয়ে হানাদারদের বিরুদ্ধে গুলি চালাবার আদেশ দেয়া হল। ধৃত রাজাকাররা সে আদেশ পালন করল। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে গেল। চাঙ্গা হয়ে উঠল তারা। গুলি আর পাল্টা গুলি চলতে থাকল।

পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী দল লঞ্চে মাদারীপুরের দিকে তৎপরতা আরও জোরদার করার জন্য অগ্রসর হয়। এই খবর মুক্তিফৌজের কাছে পৌঁছলে ২০ জনের একটি গেরিলাদল পালং থানার রাজগঞ্জের কাছে নদীর তীরে পাকসেনাদের জন্য অ্যামবুশ পেতে বসে থাকে। সকাল ১০টার দিকে লঞ্চটি অ্যামবুশের আওতায় এলে গেরিলারা তাদের উপর আক্রমণ চালায়। ফলে ১০-১২ জন পাকসেনা হতাহত হয়। পরে লঞ্চটি ফরিদপুর ফিরে যায়।

আলফাডাঙ্গা থানার প্রায় ১৫ কি.মি. দূরে গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়ার পাকবাহিনীর ঘাঁটি থেকে পার্শ্ববর্তী বোয়ালমারী থানার উদ্দেশ্যে বারাশিয়া নদী পথে লঞ্চ যোগে হানাদারবাহিনী যাওয়ার সময় বানা ইউনিয়নের শিরগ্রাম মাদ্রাসা ও গোরস্থানের কাছে বারাশিয়া নদীর দুই তীরে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা মো. আতিয়ার রহমানসহ ৪ জন সদস্য শাহাদৎ বরণ করেন। পাকবাহিনীর কয়েকজন সৈন্য মারা যায়।
সিলেটে পাকহানাদার বাহিনী ভোগা ও করমপুর গ্রামে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যুহের ওপর তীব্র হামলা চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণ শুরু করলে উভয়পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে পাকবাহিনীর ৩ জন সৈন্য ও ৪ জন রাজাকার নিহত হয়।
৭ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনী পাকহানাদার বাহিনীর প্রেমতলী অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়। এতে ২ জন পাকসৈন্য ও ২ জন রাজাকার নিহত হয় এবং ৭ জন আহত হয়।
চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ শেষে কয়েকজন পাকসেনা অফিসার হেঁটে যাওয়ার সময় পোলো গ্রাউন্ডের প্রবেশ মুখে মুক্তিযোদ্ধা এম এ জিন্নাহর দল তাদের ওপর গ্রেনেড আক্রমণ চালায়। এতে ৩ জন পাকসেনা অফিসার নিহত হয়। রাজশাহী জেলার রানী শংকইল হরিপুর রোডে পাকসৈন্যবাহী একটি গাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বিস্ফোরিত হলে ৫ জন সৈন্য নিহত হয়। একই এলাকায় মুক্তিফৌজের ভিন্ন অপারেশনে আরও ৬ জন সৈন্য নিহত হয়।

ফেনীতে মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীর দুই প্লাটুন সৈন্যকে সিলোনিয়া নদী অতিক্রমের সময় আক্রমণ করে। এতে পাকবাহিনীর ১৫ জন সৈন্য নিহত হয়। বাকী সৈন্যরা মর্টারের শেলবর্ষণ করতে করতে নিজেদের বাঁচিয়ে পালিয়ে যায়। ৬ নম্বর সেক্টরে লে. কর্নেল দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ৩০ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল মোগলহাট রেল লাইনের ওপর অ্যান্টি ট্যাংক মাইন, গ্যালাটিন ও পিইকে বসিয়ে অবস্থান নেয়। পাকসেনা বোঝাই একটি ট্রেন অগ্রসর হলে মাইনের আঘাতে ইঞ্জিনসহ সামনের কইয়েকটি বগী বিধ্বস্ত হয়। পাকসেনারা সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তিনদিক থেকে ঘিরে ফেললে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে। এই সংঘর্ষে পাকবাহিনীর ৫ জন সৈন্য নিহত ও অনেক আহত হয়। অপরদিকে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও লে. কর্নেল দেলোয়ার হোসেনসহ ৪ জন যোদ্ধা আহত হয়।

৫০ জনের একটি গেরিলা দল রাত ৮টার সময় মাদারীপুরের নড়িয়া থানার ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। প্রায় ৩ ঘণ্টা যুদ্ধের পর মুক্তিফৌজের গেরিলারা থানাটি দখল করে। যুদ্ধে থানার দারোগাসহ ১৭ জন পাকসেনা ও পুলিশ নিহত হয়। থানা থেকে ৩০টি রাইফেল এবং একটি বেতার যন্ত্র গেরিলাদের হস্তগত হয়। গেরিলারা থানাটি ধ্বংস করে দেয়।

গেরিলাদের আরেকটি দল ঝিকরগাছির কাছে বরিশাল-ফরিদপুর টেলিফোন লাইনের ৬শ’ গজ কেবল নষ্ট করে দেয়। টেলিগ্রাফ বিভাগের টেকনিশিয়ানরা পাকসেনাদের পাহারায় টেলিফোন লাইনটি মেরামত করতে আসার পথে গেরিলাদের বসানো মাইন বিস্ফোরণে তাদের জিপটি ধ্বংস হয়ে যায়। পাকসেনাদের আরেকটি টহলদার দল মাদারীপুরের হাওলাদার জুট মিলের কাছে গেরিলাদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ায় চারজন পাকসেনা নিহত হয়।

গেরিলারা মাদারীপুরের কাছে ঘাট মাঝিতে প্রায় ৩০-৪০ গজ রাস্তা কেটে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। মাদারীপুর-ফরিদপুর রাস্তায় সমাদ্দার ফেরিঘাটে একটি ফেরি অগ্নিসংযোগে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। একটি মোটর লঞ্চও ধ্বংস করা হয়। এই মোটর লঞ্চটি পাকসেনারা টহল দেয়ার কাজে ব্যবহার করত।

কুমিল্লার নয়ানপুরে পাকসেনারা অবস্থান নেয় এবং গভীর রাতে ২ প্লাটুন সৈন্য সিলোনিয়া নদী অতিক্রমের চেষ্টা করে। নদী পার হবার সময় নৌকায় মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করে। এতে বেশ কয়েকজন পাক সেনা হতাহত হয়। বাকিরা মর্টার শেলিং করতে করতে পলায়ন করে। কোদালকাঠি চর ছাড়া সম্পূর্ণ রৌমারী ছিল মুক্তাঞ্চল। লে. ক. জিয়াউর রহমান তার ব্রিগেড নিয়ে রংপুর ছেড়ে সিলেটের দিকে যাবার সময় ২ কোম্পানী মুক্তিযোদ্ধা যাবার পথে রাতে সন্তর্পনে কোদালকাঠি প্রবেশ করে এবং পরিখা খনন করে মাঠের একদিকে অবস্থান নেয়। সকালে মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি টের পেয়ে হানাদারেরা হামলা করে। দীর্ঘক্ষণ প্রতিহত করতে করতে একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা পরিখা থেকে বের হয়ে আসে এবং সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে চূড়ান্ত আক্রমণ চালায়। প্রতিরোধে পাকসেনারা ব্যর্থ হয়ে গানবোট নিয়ে পালিয়ে যায়।

চাঁদপুরের কাছে আকন্দহাট বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কোম্পানি তাদের বেস স্থাপন করে। স্থানীয় দালাল এবং রাজাকাররা পাকসেনাদের এই বেস সম্বন্ধে খবর দেয়। সকাল ৬টার সময় পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী দল স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় এই বেসটি আক্রমণের জন্য আসে। আক্রমণের সময় তারা নৌকার সাহায্যে খাল পার হয়ে বেসে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। পাকসেনারা কাছাকাছি পৌঁছলে মুক্তিফৌজের সৈনিকেরা তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। দুই ঘণ্টার যুদ্ধে একজন মেজরসহ ৩৭ জন পাকসেনা নিহত হয়। ঢাকায় সামরিক আদালত ৪৮ জন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যকে সামরিক আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দেয়।

সিলেটে শান্তি কমিটির আহবায়ক শহীদ আলীর সভাপতিত্বে এক সভায় ব্রিগেডিয়ার ইখতেখার আহম্মদ রানা প্রশংসনীয় কাজের জন্য রাজাকার সদস্য আদম মিয়া, ওসমান গনি ও আবদুর রহমানকে টিক্কা খানের দেয়া পদক ও প্রশংসাপত্র প্রদান করে। সভায় নিহত দালাল তালাতের নামে হরিপুরের নামকরণ করা হয় ‘তালাতনগর’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ড. হাসানউজ্জামানের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক খান এ সবুর। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শাহ আজিজুর রহমান, ড. মোহর আলী, অধ্যাপক আফসার উদ্দিন প্রমুখ নেতা। সভায় পাকিস্তান সেনা বাহিনীর কর্নেল বশির উপস্থিত ছিলেন।। সবুর খান বলেন, পাকিস্তানকে রক্ষা করিবার জন্য প্রতিটি পাকিস্তানী ঐক্যবদ্ধ। সেনাবাহিনী একা নহে তাদের সঙ্গে রহিয়াছে গোটা জাতি। এ পর্যন্ত দুই লাখ রাজাকার ট্রেনিং সমাপ্ত করিয়াছে। প্রতিদিন আরও অনেকে যোগ দিতেছে। তিনি শান্তির জন্য এই এলাকায় প্রভাব বিস্তারের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন, সীমান্তে জাতিসঙ্ঘ বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব পাকিস্তান মানিয়া নিয়াছে কিন্তু ভারত তা মানিয়া নেয় নাই। ভারত নাকি বলিয়াছে শরণার্থীরা পূর্ব পাকিস্তানে ফিরিয়া যাইবে না তারা নাকি বাংলাদেশে যাইবে। তিনি বলেন, তাহাদের হয় পূর্ব পাকিস্তান নয় ভারত এই দুইটার একটা বাছিয়া নিতে হইবে।

এদিন সকাল ১১ টায় ইসলামী ছাত্রসংঘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ছাত্র-গণজমায়েতের আয়োজন করে। এতে বক্তব্য রাখেন দলের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী, ঢাকা শহর ছাত্রসংঘের সভাপতি শামসুল হক ও সাধারণ সম্পাদক শওকত ইমরান। সভায় ৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের শহীদদের জন্য দোয়া ও তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করা হয়। ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা ও পাকিস্তানের সংহতির জন্য দোয়া করা হয়। পরে একটি মিছিলের আয়োজন করা হয়।

About desk

Check Also

এই মাত্র পাওয়াঃ প্রাথমিকের শূন্য পদে নিয়োগ শিগগিরই

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শূন্য পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শিগগিরই সম্পন্ন করা হবে। রোববার (১৯ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *